সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ছিলেন দু’জাহানের সরদার রাসূলে মাকবূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে গড়া মুবারক কাফেলা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাদের ভালবাসা ছিল আপন জীবনের চেয়েও বেশী। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পর্ণাঙ্গ মু’মিন
হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও সকল মানুষের চেয়ে প্রিয় না হই’। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ বাণীর আলোকে ঈমানের পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্য সাহাবায়ে কিরাম (রা.) হুব্বে রাসূলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাঁদের আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত। রাসলুল্লাহ (সা.)-এর যে কোন বাণী তাঁরা বিশ্বাস করতেন অকপটে, যে কোন নির্দেশ পালত করতেন নিদ্বির্ধায়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সাহাবায়ে কিরামের আনুগত্যের কয়েকটি নমুনা একই শিরোনামে আমার অপর একটি লেখায় তুলে ধরেছি। পর্বের লেখার সাথে সংযোজন হিসেবে এখানে আরও কয়েকটি ঘটনা উপস্থাপন করা হলো। নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষ। ২৬ রজব দিবাগত রাতে মালিকে আ’লার পরম সান্নিধ্য অর্জনের জন্য রাসলে পাক (সা.) মি’রাজে গমন করেন। মি’রাজ রজনীতে তিনি মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের নানা নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। একই রাতের মধ্যে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় গমন, সেখানে পর্ববর্তী নবী-রাসলগণকে নিয়ে জামা‘আতে নামায আদায়, সাত আসমান পরিভ্রমণ, জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন, সিদরাতুল মুন্তাহায় অবতরণ, আল্লাহর দীদার অর্জন ও তাঁর সাথে কথোপকথনের মতো গুরূত্বপর্ণ কার্য সম্পাদন করেন মহানবী (সা.)। একই রাতের মধ্যে এতসব কার্য সম্পাদন করা সত্যিই বিস্ময়কর ছিল এবং তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করাও কঠিন ছিল। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মি’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তন করেন তখন উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে হানী (রা.) তাঁকে এ ঘটনা বর্ণনা করতে বারণ করেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) আপন রবের কুদরতের নিদর্শন বর্ণনা করা থেকে তো বিরত থাকতে পারেন না। তিনি যখন মি’রাজ রজনীর বিবরণ তুলে ধরলেন তখন কাফির-মুশরিকরা তা মোটেই বিশ্বাস করল না। তারা এর পক্ষে নানা প্রমাণ প্রত্যক্ষ করতে চাইল।
মি’রাজের বিষয়ে হযরত উম্মে হানী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- যে রাতে রাসলুল্লাহ (সা.)-এর মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল সে রাতে তিনি আমার ঘরেই ছিলেন। রাতে হঠাৎ আমি তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কুরায়শরা না জানি তাকে কোন্ বিপদে ফেলে দিয়েছে এ ভাবনায় সে রাতে আমার ঘুম হয় নি। পরে জানতে পারলাম এমন কিছু হয় নি। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই বর্ণনা করেন, সে রাতে জিব্রাইল (আ.) আমার নিকট আগমন করলেন এবং হাত ধরে আমাকে নিয়ে চললেন। হঠাৎ দেখতে পেলাম দরজার সামনে গাধার চেয়ে বড় কিন্তু খচ্ছরের চেয়ে ছোট একটি জন্তু দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমাকে এর উপর সওয়ার করালেন। অতঃপর তা আমাকে নিয়ে পথ অতিক্রম করতে করতে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছল। তখন আমি হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে দেখলাম। তিনি স্বভাব-চরিত্র ও আকার-আকৃতিতে আমার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন। এ সফরে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথেও আমার স্বাক্ষাত হয়। তাঁর গায়ের রং ছিল গোধুলী বর্ণের, দেহের গঠন লম্বা ধরনের ও চুল ছিল সোজা। তাকে দেখতে অনেকটা ‘আদাদ শানওয়া’ গোত্রের লোকদের মতো। অনুরূপভাবে মারয়াম তনয় হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথেও আমার সাক্ষাত হয়। তিনি ছিলেন মধ্যমাকৃতির। তাঁর গায়ের রং ছিল সাদা-লাল মিশ্রিত। তাঁকে কিছুটা উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফী (রা.)-এর মতো দেখা যেত। এ সফরে আমি দাজ্জালকেও দেখেছি। তার ডান চোখটি ছিল কানা। তাকে কাতান ইবনে আবদুল উযযার মতো দেখা যেত।
নবী করীম (সা.) বলেন, তারপর আমি যা দেখেছি তাহুবহু কুরায়শদের নিকট বর্ণনা করার ইচ্ছা করলাম। তখন উম্মে হানী (রা.) চাদর টেনে ধরলেন এবং বললেন, আমি আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছি যে, যদি আপনি তাদের নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেন তবে তারা আপনার কথা অস্বীকার করবে এবং আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। আমার আশংকা হয় আপনি তাদের নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করলে তারা আপনার দিকে হাত প্রসারিত করবে- আপনার সাথে বেয়াদবী করবে। উম্মে হানী (রা.) বলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) ঝাটকা মেরে আমার হাত থেকে তার কাপড় ছাড়িয়ে নিলেন। তারপর কুরায়শদের নিকট গেলেন এবং আমাকে যা বলেছেন তাদেরকেও তা বললেন। এ সংবাদ শুনে জুবায়র ইবনে মুত‘ইম দাঁড়িয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! তোমার যদি কোন মান-সম্মান থাকত তবে তুমি আমাদের মধ্যে থেকে এরূপ অবিশ্বাস্য কথা বলতে না। অন্য একজন বলিল, হে মুহাম্মদ! অমুক অমুক স্থানে তুমি আমাদের উটগুলোর নিকট দিয়ে পথ অতিক্রম করেছ কি? তিনি বলিলেন, হাঁ, অতিক্রম করেছি। আল্লাহ্র কসম! তাদের একটি উট হারিয়ে গেছে এবং তারা তা তালাশ করতেছে। পরে অন্য একজন বলিল, অমুক গোত্রের উটের নিকট দিয়ে কি তুমি পথ অতিক্রম করেছ? তিনি বলিলেন, হাঁ, করেছি। অমুক জায়গায় তাদের সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে। তাদের নিকট একটি লাল রঙের উষ্ট্রী ছিল। এর পা ভেঙ্গে গেছে। আর তাদের নিকট একটি বড় পেয়ালায় পানিও ছিল, আমি তা পান করেছি। এরপর তারা জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বল তো দেখি, তাদের উটের সংখ্যা কত এবং তাদের রাখাল কে? জবাবে তিনি বললেন, আমি তো সেগুলোর সংখ্যা গণনা করি নি। তখনই আল্লাহ্ তাআলা ঐ যাত্রীদলটি তাঁর চোখের সামনে তুলে ধরেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) উটগুলোর সংখ্যাও বলে দেন এবং রাখালের নামও বলেন। তিনি আরও বলেন যে, অমুক গোত্রের উটের রাখালের নাম ইব্নে আবী কুহাফা এবং অমুক অমুক। আগামী কাল সকালে তারা সানিয়াতে পৌঁছবে। এ বিষয়ে নবী করীম (সা.) সত্য বলেছেন কি না তা যাচাই ও পরীক্ষা করে দেখার জন্য তারা অনেকেই সানিয়া নামক স্থানে গিয়ে বসে রইল। সত্য সত্যই তারা ঐ যাত্রীদলকে দেখতে পেল এবং তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল। তারপর তারা তাদেরকে প্রশ্ন করল, তোমাদের উট হারিয়ে গিয়েছিল কি? তারা উত্তর দিল, হাঁ, হারিয়ে গিয়েছিল। এরপর তাহারা দ্বিতীয় দলকে প্রশ্ন করল, তোমাদের লাল উষ্ট্রীটির পা কি ভেঙ্গে গিয়েছে? তারা উত্তর দিল, হাঁ। তারা আবার প্রশ্ন করল, তোমাদের কাছে একটি পানির বড় পেয়ালা ছিল কি? জাববে আব বাক্র নামের লোকটি বলিল হাঁ, আল্লাহ্র শপথ! আমি নিজেই তা রেখেছিলাম। তা থেকে কেউ পানি পান করেছে, নতুবা কেউ তা মাটিতে ফেলে দিয়েছে (তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩য় খন্ড, পৃ. ২৩; সীরাতুল মুসতাফা, ১ম খন্ড, পৃ. ৩১১-১২)।
সীরাতুল মুসতাফার বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, মি’রাজের ঘটনা কুরায়শদের সামনে বর্ণনা করার পর তারা অবাক হয়ে গেল। কেউ কেউ আশ্চর্য হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। আবার কেউ তালি বাজাতে আরম্ভ করিল। কিছু পৌত্তলিক এ ঘটনা শুনে দ্রতবেগে হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা.)-এর নিকট গিয়ে হাযির হল। তারা তাঁকে বলল, আপনার বন্ধুর খবর নিয়েছেন কি? তিনি বলতেছেন, আমাকে এ রাতেই বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হযরত আবুবকর- (রা.) জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি সত্যিই কি এ কথা বলেছেন? তারা বলিল, হাঁ, বলেছেন। আবুবকর (রা.) বললেন, তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন তবে ঠিকই বলেছেন। তখন লোকেরা বলিল, আপনি কি এ ব্যাপারে তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করেন যে, তিনি একই রাতে বায়তুল মুকাদ্দাস গমন করে ভোর হওয়ার আগেই আবার ফিরে এসেছেন। তিনি বললেন, হাঁ, আমি তো এ অপেক্ষাও কঠিন এবং জটিল বিষয়ে তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করি। অর্থাৎ আসমানের খবরের বিষয়, যা এক রাতের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে তাঁর নিকট আসে, আমি তাও বিশ্বাস করি [সীরাত বিশ্বকোষ]।
মি’রাজের এ বিবরণ থেকে একটা দিকনিদ্ষ্ট যে, এ আলৌকিক ঘটনা কাফির-মুশরিকরা কোনক্রমেই বিশ্বাস করতে চায় নি। নানাভাবে তাদের নিকট ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলেও তারা একে যাদু বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করল। কিন্তু কোন প্রমাণাদি ছাড়াই বিনা বাক্য ব্যয়ে এ ঘটনাকে সত্য বলে মেনে নিলেন হযরত আব বকর (রা.)। রাসলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি তাঁর কতইনা বিশ্বাস ও আনুগত্য! এমনিভাবে সকল সাহাবায়ে কিরামের রাসলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাদের বিশ্বাস ও আনুগত্যের প্রমাণ স্বরূপ মি’রাজের ঘটনাকে সত্য বলে মেনে নিলেন।
ারাসলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরতের পর আল্লাহর নির্দেশে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। এতে মদীনায় বসবাসরত ইয়াহুদীরা আনন্দিত হয়। হাদীস শরীফের বর্ণনানুযায়ী রাসলুল্লাহ (সা.) ষোল কিংবা সতের মাস অপর বর্ণনায় দশোর্ধ মাস বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ বানিয়ে সালাত আদায় করেছিলেন। কিন্তু তিনি ইবরাহীম (আ.)-এর কিবলাহ কা’বাকেই কামনা করতেন। তিনি এর জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করতেন এবং এ বিষয়ে ওহী নাযিলের প্রত্যাশায় আকাশের পানে তাকিয়ে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইচ্ছানুযায়ী আল্লাহ তাআলা কা’বাকে মুসলিম জাতির কিবলাহ নির্ধারণ করে দিলেন। যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ঘোষণা নিয়ে জিব্রাঈল (আ.) হাযির হলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কিরামের একদল নিয়ে মসজিদে বনী সালিম-এ যুহরের নামাযে রত ছিলেন। ইতোমধ্যে দু’রাকা‘আত নামায শেষও হয়ে গেছে। এ সময় হযরত জিব্ররাইল (আ.) আল্লাহর প্রত্যাদেশে বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে ফিরে সালাত আদায়ের ইঙ্গিত করলে রাসলুল্লাহ (সা.) বায়তুল্লাহ’র দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর অনুসরণে সাহাবায়ে কিরাম (রা.)ও কোন বাক্য ব্যয় না করে কা’বার দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। কী অনুপম আনুগত্য তাঁদের!
এ মসজিদে সেদিন দু’রাকাত নামায বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে এবং দু’রাকাআত নামায কা’বা শরীফের দিকে মুখ করে আদায় করা হয়েছিল বিধায় পরবর্তীতে এটি ‘মসজিদে যুল কিবলাতায়ন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
াবদরযুদ্ধে শোচনীয়ভাবে মুসলমানদের হাতে পরাজয় বরণ করে মক্কার কাফির বাহিনী। এ পরাজয়কে তারা নিজেদের জন্য অত্যš অপমানজনক হিসেবে বিচেনা করে, এর প্রতিশোধ ¯žৃহা তাদেরকে বেপরোয়া করে তোলে। নিহত সরদারদের আÍীয়-স্বজনরা তাদেরকে আরো ক্ষেপিয়ে তোলে। ফলে তারা প্রতিজ্ঞা করে ঃ আমরা যতদিন এ পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ না করব, ততদিন স্ব¯ির নিশ্বাস নেব না। তারা মক্কাবাসীদের কাছে আবেদন জানালো, তাদের বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া থেকে যে অর্থ-স¤žদ নিয়ে এসেছে, তা সবই যেন এ অভিযানে ব্যয় করা হয়- যাতে মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সঙ্গীদের কাছ থেকে নিহত ব্যক্তিদের প্রতিশোধ গ্রহণ করা যেতে পারে। এ আবেদনে সবাই সাড়াও দিল। সে মতে তৃতীয় হিজরীতে কুরায়শদের সাথে অন্যান্য কয়েকটি গোত্রও মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। এমনকি, ¯ীলোকেরাও পুর€ষদের সাথে যোগদান করলো- যাতে প্রয়োজনবোধে পুর€ষদের উৎসাহিত করে পশ্চাদপসরণে বাধা দিতে পারে। তিন হাজার যোদ্ধার বিরাট বাহিনী অ¯-শ¯ে সুসজ্জিত হয়ে যখন মদীনা থেকে তিন চার মাইল দরে ওহুদ পাহাড়ের সন্নিকটে শিবির স্থাপন করলো, তখন রাসলুল্লাহুল্লাহ্ (সা.) সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করলেন। পরাশর্মক্রমে মহানবী (সা.) যখন মদীনা থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বের হলেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রায় এক হাজার যোদ্ধা। পথিমধ্যে মুনাফিক আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই প্রায় তিনশত লোকের একটি দল নিয়ে রা¯া থেকে ফিরে গেল। অবশেষে হুযর আকরাম (সা.) সর্বমোট সাতশত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছলেন। তিনি স্বয়ং সামরিক কায়দায় এমনভাবে সৈন্য সমাবেশ করলেন, যাতে ওহুদ পাহাড় থাকলো পিছনের দিকে। তিনি হযরত মুসআব ইবনে উমায়রের হাতে পতাকা দান করলেন। হযরত যুবায়র ইবনে আওয়ামকে সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত করলেন। হযরত হামযার হাতে বর্মহীন সৈন্যদের পরিচালনাভার অর্পণ করলেন। পশ্চাৎদিক থেকে আক্রমণের ভয় থাকায় পঞ্চাশ জন তীরন্দাজের একটি বাহিনীকে সেদিকে নিযুক্ত করলেন এবং তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, তারা যেন পশ্চাৎদিকে টিলার উপর থেকে হিফাযতের দায়িত্ব পালন করেন। সৈন্যদের জয়-পরাজয়ের সাথে তাদের কোন স¤žর্ক থাকবে না এবং কোন অবস্থাতেই তারা স্থানচ্যুত হবে না। আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়র এ তীরন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত হলেন। কুরায়শরা বদরযুদ্ধে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। তাই তারাও শ্রেণীবদ্ধভাবে সৈন্য সমাবেশ করলো।
অতঃপর যুদ্ধ আরম্ভ হলো। প্রথম দিকে মুসলমানদের পাল্লাই ভারী ছিল। শত্র€সৈন্য ইত¯তঃ পলায়ন করতে লাগলো। বিজয় সমাপ্ত হয়েছে মনে করে মুসলমান সৈন্যরা গণীমতের মালামাল সংগ্রহে প্রবৃত্ত হলেন। শত্র€দের পলায়ন করতে দেখে ওহুদ পাহাড়ের পেছন দিকে হুযর (সা.) কর্তৃক নিযুক্ত তীরন্দাজ সৈন্যরাও স্থান ত্যাগ করে পাহাড়ের পাদদেশের দিকে আসতে লাগলেন। অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র রসলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের স্থান ত্যাগ করতে বারণ করলেন। কিন্তু কয়েকজন ছাড়া সবাই বলল ঃ হুযরের নির্দেশটি ছিল সাময়িক। এখন আমাদের সবার সাথে মিলিত হওয়া উচিত। এ সুযোগে কাফির বাহিনীর অধিনায়ক খালেদ ইবনে ওয়ালীদ, যিনি তখনও মুসলমান হননি, পাহাড়ের পেছন দিক থেকে ঘুরে এসে গিরিপথে আক্রমণ করে বসলেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়র অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে এ আক্রমণ প্রতিহত করতে চাইলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। খালেদের সৈন্যবাহিনী ঝড়ের বেগে হঠাৎ মুসলমানদের উপর পতিত হলো। অপরদিকে পলায়নপর শত্র€সৈন্যও ফিরে এসে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। এভাবে যুদ্ধের গতি স¤žর্ণ পাল্টে গেল। এ আকষ্মিক বিপদে কিংকর্তব্যবিমঢ় হয়ে মুসলিম বাহিনীর একটি বৃহৎ অংশ যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করল। এতদসত্ত্বেও কিছুসংখ্যাক সাহাবী অমিত তেজে যুদ্ধ করে যাŽিছলেন। ইতোমধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, রাসলুল্লাহ (সা.) শাহাদত বরণ করেছেন। এ সংবাদে মুসলমানদের অবশিষ্ট চেতনাও বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হলো এবং তাঁরা সাহস হারিয়ে ফেললেন। রাসলুল্লাহ (সা.)-এর চারপাশে তখন মাত্র দশ-বারো জন জীবন উৎসর্গকারী সাহাবী বিদ্যমান। হযরত জাবির (রা.) বলেন ঃ মুসলমানদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মাত্র এগার জন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। হযরত তালহা (রা.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। কুরায়শ সৈন্যরা তখন ঝড়ের বেগে এগিয়ে যাŽিছল। তখন রাসলুল্লাহ (সা.) বললেন ঃ কে এদের প্রতিরোধ করবে? হযরত তালহা (রা.) বলেন উঠলেন ঃ আমি, ইয়া রসলাল্লাহ। অন্য একজন আনসার সাহাবী বলেন ঃ আমি হাজির আছি। মহানবী (সা.) আনসার সাহাবীকে অগ্রসর হতে আদেশ দিলেন। তিনি যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে গেলেন। শত্র€পক্ষের আরেকটি দলকে অগ্রসর হতে দেখে তিনি আবার উপরোক্ত প্রশ্ন উŽচারণ করলেন। এবারও হযরত তালহা (রা.) পর্বের ন্যায় উত্তর দিলেন। তিনি নির্দেশ পেলেই সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। কিন্তু মহানবী (সা.) এবারও অন্য একজন আনসারকে পাঠিয়ে দিলেন। ফলে হযরত তালহার বাসনা পর্ণ হলো না। এভাবে সাত বার প্রশ্ন হলো এবং হযরত তালহা প্রত্যেকবার নির্দেশ লাভে ব্যর্থ হলেন। অন্যান্য সাহাবীকে পাঠিয়ে দেয়া হলো এবং তাঁরা শহীদ হয়ে গেলেন [ তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন]। কী অনুপম আনুগত্য তাঁদের। কাফিরদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য যখন তাদের সকলেরই পলায়ন করার কথা তখনও তালহা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবীগণ রাসলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ পালনের জন্য অপেক্ষমান। শুধু তাই নয় এরই মধ্যে রাসলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে কাফিরদের মুকাবিলা করতে করতে শহীদও হয়ে গেলেন সাতজন। সুবহানাল্লাহ!
াইসলামের প্রথম যুগে মদ্যপান বৈধ ছিল। পরবর্তীতে তা হারাম হয়। মদ্যপান হারামের ঘোষণা প্রথমবারই আসে নি। প্রথমে আল কুরআনুল করীমের মাধ্যমে মদ্যপানের মন্দ দিকগুলো মানুষের নিকট তুলে ধরা হয়। তারপর নামাযের সময় একে নিষিদ্ধ করা হয় এবং সর্বশেষ কঠোরভাবে একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যখন আল কুরআনের মাধ্যমে মদ্যপান হারাম ঘোষণা হলো তখন রাসলুল্লাহ (সা.) মদ পান না করার আদেশ জারী করলেন। আদেশ পাওয়া মাত্র সাহাবীগণ নিজ নিজ ঘরে ব্যবহারের জন্যে রক্ষিত মদ ততক্ষণাৎ ফেলে দিলেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, যখন রাসলে-করীম (সা.)এর প্রেরিত এক ব্যক্তি মদীনার অলি-গলিতে প্রচার করতে লাগলেন যে, মদ্য পান হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তখন যার হাতে শরাবের যে পাত্র ছিল, তা তিনি সেখানেই ফেলে দিয়েছিলেন। যার কাছে মদের কলস বা মটকা ছিল, তা ঘর থেকে তৎক্ষণাৎ বের করে ভেঙ্গে ফেলেছেন। হযরত আনাস (রা.) তখন এক মজলিসে মদ্যপানে সাকীর কাজ স¤žাদন করছিলেন। আব তালহা, আব ওবায়দা ইবনুল জাররাহ, উবাই ইবনে কা’ব, সুহায়ল (রা.) প্রমুখ নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ সে মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। প্রচারকের ঘোষনা কানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন- এবার সম¯ শরাব ফেলে দাও। এর পেয়ালা, মটকা, হাঁড়ি ভেঙ্গে ফেল। অন্য বর্ণনায় আছে- হারাম ঘোষণার সময় যার হাতে শরাবের পেয়ালা ছিল এবং তা ঠোঁট ¯žর্শ করছিল, তাও তৎক্ষণাৎ সে অবস্থাতেই দুরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সেদিন মদীনায় এ পরিমাণ শরাব নিক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, বৃষ্টির পানির মত শরাব প্রবাহিত হয়ে যাŽিছল এবং দীর্ঘদিন পর্যš মদীনার অলি-গলির অবস্থা এমন ছিল যে, যখনই বৃষ্টি হতো তখন শরাবের গন্ধ ও রং মাটির উপর ফুটে উঠত।
যখন আদেশ হল, যার কাছে যে মদ আছে তা অমুক স্থানে একত্রিত কর, তখন সাহাবীগণ নির্ধারিত স্থানে সব মদ একত্রিত করলেন। হুযর (সা.) স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হয়ে স্বহ¯ে শরাবের অনেক পাত্র ভেঙ্গে ফেললেন এবং অবশিষ্টগুলো সাহাবীগণের দ্বারা ভাঙ্গিয়ে দিলেন। জনৈক সাহাবী মদের ব্যবসা করতেন এবং সিরিয়া থেকে মদ আমদানী করতেন। ঘটনাচক্রে তখন তিনি মদ আনার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গিয়েছিলেন। যখন তিনি ব্যবসায়ের এ পণ্য নিয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং মদীনায় প্রবেশ করার পর্বেই মদ হারাম হওয়ার সংবাদ তাঁর কানে পৌঁছল, তখন সে সাহাবীও তাঁর সমুদয় মাল, যা অনেক মুনাফার আশায় আনা হয়েছিল, এক পাহাড়ের পাদদেশে রেখে এসে হুযরে আকরাম (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে এসব স¤žদের ব্যাপারে কি করতে হবে তৎস¤žর্কে নির্দেশ প্রার্থনা করলেন। মহানবী (সা.) হুকুম করলেন- মটকাগুলো ভেঙ্গে সম¯ শরাব ভাসিয়ে দাও। অতঃপর বিনা আপত্তিতে তিনি তাঁর সম¯ পুঁজির বিনিময়ে সংগৃহীত এ পণ্য স্বহ¯ে মাটিতে ঢেলে দিলেন। এটাও ইসলামের মু’জিযা এবং সাহাবীগণের বিস্ময়কর আনুগত্যের নিদর্শন।
মানুষ কোন বিষয়ে অভ্য¯ হয়ে গেলে তা ত্যাগ করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। মদ্যপানে তখন সকলেই এমন অভ্য¯ ছিলেন যে, অল্পদিন তা থেকে বিরত থাকাও স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। কিন্তু নবী করীম (সা.)-এর একটিমাত্র নির্দেশই তাঁদের অভ্যাসে এমন অপর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করল যে, তারপর থেকে তাঁরা শরাবের প্রতি তেমনি ঘৃণা পোষণ করতে লাগলেন, যেমন পর্বে তাঁরা এর প্রতি আসক্ত ছিলেন [তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন]।
াআকাবার দ্বিতীয় শপথে রাসলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে মদীনাবাসী ৭৩ জন মুসলমান উপস্থিত। গভীর রাতে বৈঠক চলছে। মদীনাবাসীর দাবী তারা রাসলুল্লাহ (সা.) কে মদীনাতে যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান করবেন। বৈঠকে রাসলুল্লাহ (সা.) এর চাচা আব্বাসও উপস্থিত। তিনি তখনও মুসলমান হন নি। কিন্তু ভাতিজার কর্ম স্বচক্ষে দেখার এবং আনসারদের আšরিকতা ও আগ্রহের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার ইŽছায় তিনি বৈঠকে উপস্থিত হন। এতে তিনিই প্রথম বক্তব্য রাখেন। মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মুহাম্মদ (সা.) স¤žর্কে তারা যেরূপ অবগত আছেন যে, তিনি নিজ জন্মস্থানে সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করছেন এবং তাঁর গোত্র এখন পর্যš তাঁর সুরক্ষা করে আসছে। কিন্তু এখন যেহেতু তিনি মদীনাবাসীদের সাথে যেতে ইŽছুক সেহেতু তিনি (আব্বাস) বিষয়টি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করার জন্য তাদেরকে পরামর্শ দেন। তিনি তাদেরকে পুণরায় স্মরণ করিয়ে দেন, যদি তারা তাদের প্রতিজ্ঞা পালনে নিশ্চিত হন এবং রাসলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর শত্র€দের বির€দ্ধে সুরক্ষাদানে সক্ষম হন, তবে তার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু যদি তাঁরা মনে করেন যে, তিনি তাদের সাথে যোগদানের পর চাপের মুখে তাঁকে ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন কিংবা তাঁকে শত্র€দের নিকট সমর্পণ করবেন, তাহলে তিনি যে অবস্থায় আছেন তাঁকে সে অবস্থায় থাকতে দেওয়াই বাঞ্ছনীয় হবে।
তিনি তার বক্তব্য শেষ করার আগেই তদুত্তরে আনসারগণ বললেন, ‘আমরা আপনার বক্তব্য শুনেছি’। অতঃপর রাসলুল্লাহ (সা.)-কে উদ্দেশ্যে করে তারা বললেন, আপনি বলুন, হে আল্লাহর রাসল! আপনার এবং আপনার রবের স্বার্থে যা করণীয়, আপনি সে পদক্ষেপ গ্রহণ কর€ন’।
এর পর রাসলুল্লাহ (সা.) তাঁদের উদ্দেশ্যে এক অভিভাষণ দান করেন। তিনি কুরআন মাজীদ থেকে তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে আল্লাহর রা¯ায় আহ্বান জানান, ইসলামের প্রতিও শুভেŽছা জ্ঞাপনের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেন, ‘আমি আপনাদের নিকট থেকে এ মর্মে প্রতিশ্র€তি চাŽিছ যে, আপনারা আমাকে ঐরূপ প্রতিরক্ষা দান করবেন যেরূপ আপনারা আপনাদের ¯ীলোক ও সšান-সšতিদের দান করে থাকেন।’
এর প্রেক্ষিতে আল-বারা‘আ ইব্নে মা’রূর রাসলুল্লাহ (সা.)-এর হাত মুবারক আঁকড়ে ধরে বললেন, ‘নিশ্চয়, আমরা আপনাকে সত্য ধর্মসহ প্রেরণকারী মহান রবের শপথ করে বলছি, আমরা নিশ্চয় আপনাকে ঐরূপ সুরক্ষা দান করব যেরূপ আমরা আমাদের পরিবার-পরিজন ও সšান-সšতিদের দিয়ে থাকি। কারণ আমরা যোদ্ধার জাতি এবং বাপ-দাদাদের আমল হতে উত্তরাধিকারসত্রে সশ¯।’
এ পর্যায়ে আল-বারা‘আর কথার সাথে আবুল হায়ছাম ইবনুত তায়্যিহান রাসলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, ‘ইয়া রাসলুল্লাহ! আমাদের এবং লোকদের (অর্থাৎ ইয়াহদীদের) মধ্যে একটি চুক্তি আছে এবং আমরা তা থেকে সরে আসতেছি। কিন্তু যখন তা স¤žন্ন হবে এবং আল্লাহ তাআলা আপনাকে আপনার কর্মে জয়যুক্ত করবেন, তখন কি আপনি আমাদের ফেলে আপনার স¤ž্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করবেন?’
এতে রাসলুল্লাহ (সা.) স্মিতহাস্যে জবাব দিলেন ঃ ‘না, আমার রক্ত হŽেছ আপনাদের রক্ত এবং আমার জীবন হŽেছ আপনাদের জীবন। আমি আপনাদের লোক এবং আপনারা আমার লোক। আমি তাদের বির€দ্ধে যুদ্ধ করব, যাদের বির€দ্ধে আপনারা যুদ্ধ করেন এবং তাদের সাথে শাšি স্থাপন করব, যাদের সাথে আপনারা শাšি স্থাপন করেন’।
এর পর আবুল হায়ছাম তাঁর স¤ž্রদায়ের লোকদের দিকে ফিরে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, তাদের সাথে রাসলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে যাওয়ার অর্থ এই যে, আরবদেশের সকল লোক তাদের বিপক্ষ অবলম্বন করবে এবং তাদের কটাক্ষ জ্যা-মুক্ত তীরের ন্যায় তাদের বিদ্ধ করবে। সুতরাং যদি তাঁরা এরূপ নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারেন যে, সকল ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে হলেও কোন অবস্থাতেই তারা রাসলুল্লাহ (সা.)-কে পরিত্যাগ করবেন না, তবে তারা প্রতিশ্র€তি দিয়ে তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন। তখন তাদের সকলেই সমস্বরে বলে উঠেন যে, তারা তাদের প্রতিশ্র€তি রক্ষা করবেন এবং কোন অবস্থাতেই রাসলুল্লাহ (সা.)-কে পরিত্যাগ করবেন না।
অন্যরাও এই উপলক্ষে বক্তব্য রাখেন। এভাবে আস‘আদ ইব্নে যুরারা তাঁর স¤ž্রদায়ের লোকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি আবু হায়ছামের বক্তব্যের সমর্থনে তাদের মনে করিয়ে দেন যে, তারা এমন একটি গুর€ত্বপর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করতে যাŽেছন যার ফলে তারা আরবদের শত্র€তার নিশ্চিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবেন।
তদ্র€প আব্বাস ইব্নে ‘উবাদা ইব্নে নাদলা আল-আনসারী তাঁর স¤ž্রদায়ের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বক্তব্যে বলেন, ‘হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা! রাসলুল্লাহ (সা.)-কে প্রদত্ত প্রতিশ্র€তির বিষয়বস্তু আপনারা কি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন?’ তদুত্তরে তারা বললেন, ‘হা, পেরেছি’। আব্বাস ইব্নে উবাদা অতঃপর ব্যাখ্যা করে বলেন, আপনারা প্রয়োজনে রক্তক্ষয়ী লড়াই করবেন, প্রতিশ্র€তি দিলেন। সুতরাং যদি আপনারা মনে করেন, যখন বিপদ ঘনিয়ে আসবে, আপনাদের সহায়-স¤žদ ধ্বংস হবে এবং আপনাদের নেতৃবৃন্দ নিহত হতে থাকবেন, তখন আপনারা তাঁকে পরিত্যাগ করবেন, তবে এখনই তা কর€ন। কারণ ঐরূপ করাতে, আল্লাহর কসম! আপনারা ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্র¯ হবেন। কিন্তু যদি আপনারা এরূপ নিশ্চয়তা দিতে পারেন যে, আপনারা আপনাদের বাধ্যবাধকতা পরিপর্ণরূপে পালন করবেন, যদিও তাতে আপনাদের সহায়-স¤žদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ও আপনাদের নেতৃবৃন্দ শহীদ হন, তবে এ গুর€দায়িত্ব গ্রহণ কর€ন। কারণ আল্লাহ তাআলার কসম! এটি আপনাদের ইহকাল ও পরকালের জন্য সর্বোত্তম পাথেয় হবে’।
তদুত্তরে তারা সকলেই বললেন, ‘নিশ্চয় আমরা আমাদের প্রতিশ্র€তি পালন করব, যদিও এর মল্য হিসেবে আমাদের সহায়-স¤žদ ও নেতৃবৃন্দকে বিসর্জন দিতে হয়’। এর পর আল-আব্বাস ইব্নে ‘উবাদা রাসলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসলাল্লাহ! যদি আমরা আমাদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে পারি তবে আমাদের পুরস্কার কি হবে?’ রাসলুল্লাহ (সা,) বললেন, ‘জান্নাত’। তারা বললেন ‘তা হলে আপনার হ¯দ্বয় প্রসারিত কর€ন’। রাসলুল্লাহ (সা.) তা-ই করলেন এবং তাঁরা শপথ গ্রহণ করলেন।
আকাবাতে সে স্মরণীয় রাতের কার্যবিবরণীর এ সকল সার-সংক্ষেপ হতে এটা ¯žষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আব্বাস ইব্নে আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক আনসারদের নিকট থেকে নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্র€তি গ্রহণ ছাড়াও ঐ সময় আনসারগণ নিজেরা অত্যš সতর্কতার সাথে তাঁদের কার্যক্রমের পুণর্মল্যায়ন করে এর পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন ফলাফল বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভ করেন। তাঁরা পরিপর্ণরূপে বুঝতে পারেন যে, প্রয়োজন হলে এবং রাসলুল্লাহ (সা.) চাইলে রাসলুল্লাহ (সা.) এবং ইসলামের স্বার্থে তাঁরা যুদ্ধে শহীদ হবেন এবং তাঁদের সহায়-স¤žদ ও ধন-জন কুরবানী দিবেন [সীরাত বিশ্বকোষ]।
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আকাবার দ্বিতীয় শপথে যে ৭৩ জন মদীনাবাসী রাসলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসেছিলেন তারা প্রায় সকলেই ছিলেন নও মুসলিম। কিন্তু ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাদের বিশ্বাস, আšরিকতা ও আনুগত্য অল্প সময়ে এত অধিক হয়েছিল যে, তারা রাসলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য নিজেদের জান-মাল কুররানের প্রতিশ্র€তি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। মদীনাবাসীগণ আকাবার এ শপথে যে প্রতিশ্র€তি দিয়েছিলেন বা¯ব জীবনে তাঁরা এর প্রমাণও দিয়েছেন।
হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও সকল মানুষের চেয়ে প্রিয় না হই’। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ বাণীর আলোকে ঈমানের পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্য সাহাবায়ে কিরাম (রা.) হুব্বে রাসূলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাঁদের আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত। রাসলুল্লাহ (সা.)-এর যে কোন বাণী তাঁরা বিশ্বাস করতেন অকপটে, যে কোন নির্দেশ পালত করতেন নিদ্বির্ধায়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সাহাবায়ে কিরামের আনুগত্যের কয়েকটি নমুনা একই শিরোনামে আমার অপর একটি লেখায় তুলে ধরেছি। পর্বের লেখার সাথে সংযোজন হিসেবে এখানে আরও কয়েকটি ঘটনা উপস্থাপন করা হলো। নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষ। ২৬ রজব দিবাগত রাতে মালিকে আ’লার পরম সান্নিধ্য অর্জনের জন্য রাসলে পাক (সা.) মি’রাজে গমন করেন। মি’রাজ রজনীতে তিনি মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের নানা নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। একই রাতের মধ্যে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় গমন, সেখানে পর্ববর্তী নবী-রাসলগণকে নিয়ে জামা‘আতে নামায আদায়, সাত আসমান পরিভ্রমণ, জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন, সিদরাতুল মুন্তাহায় অবতরণ, আল্লাহর দীদার অর্জন ও তাঁর সাথে কথোপকথনের মতো গুরূত্বপর্ণ কার্য সম্পাদন করেন মহানবী (সা.)। একই রাতের মধ্যে এতসব কার্য সম্পাদন করা সত্যিই বিস্ময়কর ছিল এবং তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করাও কঠিন ছিল। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মি’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তন করেন তখন উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে হানী (রা.) তাঁকে এ ঘটনা বর্ণনা করতে বারণ করেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) আপন রবের কুদরতের নিদর্শন বর্ণনা করা থেকে তো বিরত থাকতে পারেন না। তিনি যখন মি’রাজ রজনীর বিবরণ তুলে ধরলেন তখন কাফির-মুশরিকরা তা মোটেই বিশ্বাস করল না। তারা এর পক্ষে নানা প্রমাণ প্রত্যক্ষ করতে চাইল।
মি’রাজের বিষয়ে হযরত উম্মে হানী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- যে রাতে রাসলুল্লাহ (সা.)-এর মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল সে রাতে তিনি আমার ঘরেই ছিলেন। রাতে হঠাৎ আমি তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কুরায়শরা না জানি তাকে কোন্ বিপদে ফেলে দিয়েছে এ ভাবনায় সে রাতে আমার ঘুম হয় নি। পরে জানতে পারলাম এমন কিছু হয় নি। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই বর্ণনা করেন, সে রাতে জিব্রাইল (আ.) আমার নিকট আগমন করলেন এবং হাত ধরে আমাকে নিয়ে চললেন। হঠাৎ দেখতে পেলাম দরজার সামনে গাধার চেয়ে বড় কিন্তু খচ্ছরের চেয়ে ছোট একটি জন্তু দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমাকে এর উপর সওয়ার করালেন। অতঃপর তা আমাকে নিয়ে পথ অতিক্রম করতে করতে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছল। তখন আমি হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে দেখলাম। তিনি স্বভাব-চরিত্র ও আকার-আকৃতিতে আমার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন। এ সফরে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথেও আমার স্বাক্ষাত হয়। তাঁর গায়ের রং ছিল গোধুলী বর্ণের, দেহের গঠন লম্বা ধরনের ও চুল ছিল সোজা। তাকে দেখতে অনেকটা ‘আদাদ শানওয়া’ গোত্রের লোকদের মতো। অনুরূপভাবে মারয়াম তনয় হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথেও আমার সাক্ষাত হয়। তিনি ছিলেন মধ্যমাকৃতির। তাঁর গায়ের রং ছিল সাদা-লাল মিশ্রিত। তাঁকে কিছুটা উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফী (রা.)-এর মতো দেখা যেত। এ সফরে আমি দাজ্জালকেও দেখেছি। তার ডান চোখটি ছিল কানা। তাকে কাতান ইবনে আবদুল উযযার মতো দেখা যেত।
নবী করীম (সা.) বলেন, তারপর আমি যা দেখেছি তাহুবহু কুরায়শদের নিকট বর্ণনা করার ইচ্ছা করলাম। তখন উম্মে হানী (রা.) চাদর টেনে ধরলেন এবং বললেন, আমি আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছি যে, যদি আপনি তাদের নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেন তবে তারা আপনার কথা অস্বীকার করবে এবং আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। আমার আশংকা হয় আপনি তাদের নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করলে তারা আপনার দিকে হাত প্রসারিত করবে- আপনার সাথে বেয়াদবী করবে। উম্মে হানী (রা.) বলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) ঝাটকা মেরে আমার হাত থেকে তার কাপড় ছাড়িয়ে নিলেন। তারপর কুরায়শদের নিকট গেলেন এবং আমাকে যা বলেছেন তাদেরকেও তা বললেন। এ সংবাদ শুনে জুবায়র ইবনে মুত‘ইম দাঁড়িয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! তোমার যদি কোন মান-সম্মান থাকত তবে তুমি আমাদের মধ্যে থেকে এরূপ অবিশ্বাস্য কথা বলতে না। অন্য একজন বলিল, হে মুহাম্মদ! অমুক অমুক স্থানে তুমি আমাদের উটগুলোর নিকট দিয়ে পথ অতিক্রম করেছ কি? তিনি বলিলেন, হাঁ, অতিক্রম করেছি। আল্লাহ্র কসম! তাদের একটি উট হারিয়ে গেছে এবং তারা তা তালাশ করতেছে। পরে অন্য একজন বলিল, অমুক গোত্রের উটের নিকট দিয়ে কি তুমি পথ অতিক্রম করেছ? তিনি বলিলেন, হাঁ, করেছি। অমুক জায়গায় তাদের সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে। তাদের নিকট একটি লাল রঙের উষ্ট্রী ছিল। এর পা ভেঙ্গে গেছে। আর তাদের নিকট একটি বড় পেয়ালায় পানিও ছিল, আমি তা পান করেছি। এরপর তারা জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বল তো দেখি, তাদের উটের সংখ্যা কত এবং তাদের রাখাল কে? জবাবে তিনি বললেন, আমি তো সেগুলোর সংখ্যা গণনা করি নি। তখনই আল্লাহ্ তাআলা ঐ যাত্রীদলটি তাঁর চোখের সামনে তুলে ধরেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) উটগুলোর সংখ্যাও বলে দেন এবং রাখালের নামও বলেন। তিনি আরও বলেন যে, অমুক গোত্রের উটের রাখালের নাম ইব্নে আবী কুহাফা এবং অমুক অমুক। আগামী কাল সকালে তারা সানিয়াতে পৌঁছবে। এ বিষয়ে নবী করীম (সা.) সত্য বলেছেন কি না তা যাচাই ও পরীক্ষা করে দেখার জন্য তারা অনেকেই সানিয়া নামক স্থানে গিয়ে বসে রইল। সত্য সত্যই তারা ঐ যাত্রীদলকে দেখতে পেল এবং তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল। তারপর তারা তাদেরকে প্রশ্ন করল, তোমাদের উট হারিয়ে গিয়েছিল কি? তারা উত্তর দিল, হাঁ, হারিয়ে গিয়েছিল। এরপর তাহারা দ্বিতীয় দলকে প্রশ্ন করল, তোমাদের লাল উষ্ট্রীটির পা কি ভেঙ্গে গিয়েছে? তারা উত্তর দিল, হাঁ। তারা আবার প্রশ্ন করল, তোমাদের কাছে একটি পানির বড় পেয়ালা ছিল কি? জাববে আব বাক্র নামের লোকটি বলিল হাঁ, আল্লাহ্র শপথ! আমি নিজেই তা রেখেছিলাম। তা থেকে কেউ পানি পান করেছে, নতুবা কেউ তা মাটিতে ফেলে দিয়েছে (তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩য় খন্ড, পৃ. ২৩; সীরাতুল মুসতাফা, ১ম খন্ড, পৃ. ৩১১-১২)।
সীরাতুল মুসতাফার বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, মি’রাজের ঘটনা কুরায়শদের সামনে বর্ণনা করার পর তারা অবাক হয়ে গেল। কেউ কেউ আশ্চর্য হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। আবার কেউ তালি বাজাতে আরম্ভ করিল। কিছু পৌত্তলিক এ ঘটনা শুনে দ্রতবেগে হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা.)-এর নিকট গিয়ে হাযির হল। তারা তাঁকে বলল, আপনার বন্ধুর খবর নিয়েছেন কি? তিনি বলতেছেন, আমাকে এ রাতেই বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হযরত আবুবকর- (রা.) জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি সত্যিই কি এ কথা বলেছেন? তারা বলিল, হাঁ, বলেছেন। আবুবকর (রা.) বললেন, তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন তবে ঠিকই বলেছেন। তখন লোকেরা বলিল, আপনি কি এ ব্যাপারে তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করেন যে, তিনি একই রাতে বায়তুল মুকাদ্দাস গমন করে ভোর হওয়ার আগেই আবার ফিরে এসেছেন। তিনি বললেন, হাঁ, আমি তো এ অপেক্ষাও কঠিন এবং জটিল বিষয়ে তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করি। অর্থাৎ আসমানের খবরের বিষয়, যা এক রাতের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে তাঁর নিকট আসে, আমি তাও বিশ্বাস করি [সীরাত বিশ্বকোষ]।
মি’রাজের এ বিবরণ থেকে একটা দিকনিদ্ষ্ট যে, এ আলৌকিক ঘটনা কাফির-মুশরিকরা কোনক্রমেই বিশ্বাস করতে চায় নি। নানাভাবে তাদের নিকট ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলেও তারা একে যাদু বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করল। কিন্তু কোন প্রমাণাদি ছাড়াই বিনা বাক্য ব্যয়ে এ ঘটনাকে সত্য বলে মেনে নিলেন হযরত আব বকর (রা.)। রাসলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি তাঁর কতইনা বিশ্বাস ও আনুগত্য! এমনিভাবে সকল সাহাবায়ে কিরামের রাসলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাদের বিশ্বাস ও আনুগত্যের প্রমাণ স্বরূপ মি’রাজের ঘটনাকে সত্য বলে মেনে নিলেন।
ারাসলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরতের পর আল্লাহর নির্দেশে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। এতে মদীনায় বসবাসরত ইয়াহুদীরা আনন্দিত হয়। হাদীস শরীফের বর্ণনানুযায়ী রাসলুল্লাহ (সা.) ষোল কিংবা সতের মাস অপর বর্ণনায় দশোর্ধ মাস বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ বানিয়ে সালাত আদায় করেছিলেন। কিন্তু তিনি ইবরাহীম (আ.)-এর কিবলাহ কা’বাকেই কামনা করতেন। তিনি এর জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করতেন এবং এ বিষয়ে ওহী নাযিলের প্রত্যাশায় আকাশের পানে তাকিয়ে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইচ্ছানুযায়ী আল্লাহ তাআলা কা’বাকে মুসলিম জাতির কিবলাহ নির্ধারণ করে দিলেন। যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ঘোষণা নিয়ে জিব্রাঈল (আ.) হাযির হলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কিরামের একদল নিয়ে মসজিদে বনী সালিম-এ যুহরের নামাযে রত ছিলেন। ইতোমধ্যে দু’রাকা‘আত নামায শেষও হয়ে গেছে। এ সময় হযরত জিব্ররাইল (আ.) আল্লাহর প্রত্যাদেশে বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে ফিরে সালাত আদায়ের ইঙ্গিত করলে রাসলুল্লাহ (সা.) বায়তুল্লাহ’র দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর অনুসরণে সাহাবায়ে কিরাম (রা.)ও কোন বাক্য ব্যয় না করে কা’বার দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। কী অনুপম আনুগত্য তাঁদের!
এ মসজিদে সেদিন দু’রাকাত নামায বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে এবং দু’রাকাআত নামায কা’বা শরীফের দিকে মুখ করে আদায় করা হয়েছিল বিধায় পরবর্তীতে এটি ‘মসজিদে যুল কিবলাতায়ন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
াবদরযুদ্ধে শোচনীয়ভাবে মুসলমানদের হাতে পরাজয় বরণ করে মক্কার কাফির বাহিনী। এ পরাজয়কে তারা নিজেদের জন্য অত্যš অপমানজনক হিসেবে বিচেনা করে, এর প্রতিশোধ ¯žৃহা তাদেরকে বেপরোয়া করে তোলে। নিহত সরদারদের আÍীয়-স্বজনরা তাদেরকে আরো ক্ষেপিয়ে তোলে। ফলে তারা প্রতিজ্ঞা করে ঃ আমরা যতদিন এ পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ না করব, ততদিন স্ব¯ির নিশ্বাস নেব না। তারা মক্কাবাসীদের কাছে আবেদন জানালো, তাদের বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া থেকে যে অর্থ-স¤žদ নিয়ে এসেছে, তা সবই যেন এ অভিযানে ব্যয় করা হয়- যাতে মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সঙ্গীদের কাছ থেকে নিহত ব্যক্তিদের প্রতিশোধ গ্রহণ করা যেতে পারে। এ আবেদনে সবাই সাড়াও দিল। সে মতে তৃতীয় হিজরীতে কুরায়শদের সাথে অন্যান্য কয়েকটি গোত্রও মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। এমনকি, ¯ীলোকেরাও পুর€ষদের সাথে যোগদান করলো- যাতে প্রয়োজনবোধে পুর€ষদের উৎসাহিত করে পশ্চাদপসরণে বাধা দিতে পারে। তিন হাজার যোদ্ধার বিরাট বাহিনী অ¯-শ¯ে সুসজ্জিত হয়ে যখন মদীনা থেকে তিন চার মাইল দরে ওহুদ পাহাড়ের সন্নিকটে শিবির স্থাপন করলো, তখন রাসলুল্লাহুল্লাহ্ (সা.) সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করলেন। পরাশর্মক্রমে মহানবী (সা.) যখন মদীনা থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বের হলেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রায় এক হাজার যোদ্ধা। পথিমধ্যে মুনাফিক আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই প্রায় তিনশত লোকের একটি দল নিয়ে রা¯া থেকে ফিরে গেল। অবশেষে হুযর আকরাম (সা.) সর্বমোট সাতশত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছলেন। তিনি স্বয়ং সামরিক কায়দায় এমনভাবে সৈন্য সমাবেশ করলেন, যাতে ওহুদ পাহাড় থাকলো পিছনের দিকে। তিনি হযরত মুসআব ইবনে উমায়রের হাতে পতাকা দান করলেন। হযরত যুবায়র ইবনে আওয়ামকে সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত করলেন। হযরত হামযার হাতে বর্মহীন সৈন্যদের পরিচালনাভার অর্পণ করলেন। পশ্চাৎদিক থেকে আক্রমণের ভয় থাকায় পঞ্চাশ জন তীরন্দাজের একটি বাহিনীকে সেদিকে নিযুক্ত করলেন এবং তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, তারা যেন পশ্চাৎদিকে টিলার উপর থেকে হিফাযতের দায়িত্ব পালন করেন। সৈন্যদের জয়-পরাজয়ের সাথে তাদের কোন স¤žর্ক থাকবে না এবং কোন অবস্থাতেই তারা স্থানচ্যুত হবে না। আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়র এ তীরন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত হলেন। কুরায়শরা বদরযুদ্ধে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। তাই তারাও শ্রেণীবদ্ধভাবে সৈন্য সমাবেশ করলো।
অতঃপর যুদ্ধ আরম্ভ হলো। প্রথম দিকে মুসলমানদের পাল্লাই ভারী ছিল। শত্র€সৈন্য ইত¯তঃ পলায়ন করতে লাগলো। বিজয় সমাপ্ত হয়েছে মনে করে মুসলমান সৈন্যরা গণীমতের মালামাল সংগ্রহে প্রবৃত্ত হলেন। শত্র€দের পলায়ন করতে দেখে ওহুদ পাহাড়ের পেছন দিকে হুযর (সা.) কর্তৃক নিযুক্ত তীরন্দাজ সৈন্যরাও স্থান ত্যাগ করে পাহাড়ের পাদদেশের দিকে আসতে লাগলেন। অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র রসলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের স্থান ত্যাগ করতে বারণ করলেন। কিন্তু কয়েকজন ছাড়া সবাই বলল ঃ হুযরের নির্দেশটি ছিল সাময়িক। এখন আমাদের সবার সাথে মিলিত হওয়া উচিত। এ সুযোগে কাফির বাহিনীর অধিনায়ক খালেদ ইবনে ওয়ালীদ, যিনি তখনও মুসলমান হননি, পাহাড়ের পেছন দিক থেকে ঘুরে এসে গিরিপথে আক্রমণ করে বসলেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়র অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে এ আক্রমণ প্রতিহত করতে চাইলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। খালেদের সৈন্যবাহিনী ঝড়ের বেগে হঠাৎ মুসলমানদের উপর পতিত হলো। অপরদিকে পলায়নপর শত্র€সৈন্যও ফিরে এসে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। এভাবে যুদ্ধের গতি স¤žর্ণ পাল্টে গেল। এ আকষ্মিক বিপদে কিংকর্তব্যবিমঢ় হয়ে মুসলিম বাহিনীর একটি বৃহৎ অংশ যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করল। এতদসত্ত্বেও কিছুসংখ্যাক সাহাবী অমিত তেজে যুদ্ধ করে যাŽিছলেন। ইতোমধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, রাসলুল্লাহ (সা.) শাহাদত বরণ করেছেন। এ সংবাদে মুসলমানদের অবশিষ্ট চেতনাও বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হলো এবং তাঁরা সাহস হারিয়ে ফেললেন। রাসলুল্লাহ (সা.)-এর চারপাশে তখন মাত্র দশ-বারো জন জীবন উৎসর্গকারী সাহাবী বিদ্যমান। হযরত জাবির (রা.) বলেন ঃ মুসলমানদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মাত্র এগার জন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। হযরত তালহা (রা.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। কুরায়শ সৈন্যরা তখন ঝড়ের বেগে এগিয়ে যাŽিছল। তখন রাসলুল্লাহ (সা.) বললেন ঃ কে এদের প্রতিরোধ করবে? হযরত তালহা (রা.) বলেন উঠলেন ঃ আমি, ইয়া রসলাল্লাহ। অন্য একজন আনসার সাহাবী বলেন ঃ আমি হাজির আছি। মহানবী (সা.) আনসার সাহাবীকে অগ্রসর হতে আদেশ দিলেন। তিনি যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে গেলেন। শত্র€পক্ষের আরেকটি দলকে অগ্রসর হতে দেখে তিনি আবার উপরোক্ত প্রশ্ন উŽচারণ করলেন। এবারও হযরত তালহা (রা.) পর্বের ন্যায় উত্তর দিলেন। তিনি নির্দেশ পেলেই সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। কিন্তু মহানবী (সা.) এবারও অন্য একজন আনসারকে পাঠিয়ে দিলেন। ফলে হযরত তালহার বাসনা পর্ণ হলো না। এভাবে সাত বার প্রশ্ন হলো এবং হযরত তালহা প্রত্যেকবার নির্দেশ লাভে ব্যর্থ হলেন। অন্যান্য সাহাবীকে পাঠিয়ে দেয়া হলো এবং তাঁরা শহীদ হয়ে গেলেন [ তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন]। কী অনুপম আনুগত্য তাঁদের। কাফিরদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য যখন তাদের সকলেরই পলায়ন করার কথা তখনও তালহা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবীগণ রাসলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ পালনের জন্য অপেক্ষমান। শুধু তাই নয় এরই মধ্যে রাসলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে কাফিরদের মুকাবিলা করতে করতে শহীদও হয়ে গেলেন সাতজন। সুবহানাল্লাহ!
াইসলামের প্রথম যুগে মদ্যপান বৈধ ছিল। পরবর্তীতে তা হারাম হয়। মদ্যপান হারামের ঘোষণা প্রথমবারই আসে নি। প্রথমে আল কুরআনুল করীমের মাধ্যমে মদ্যপানের মন্দ দিকগুলো মানুষের নিকট তুলে ধরা হয়। তারপর নামাযের সময় একে নিষিদ্ধ করা হয় এবং সর্বশেষ কঠোরভাবে একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যখন আল কুরআনের মাধ্যমে মদ্যপান হারাম ঘোষণা হলো তখন রাসলুল্লাহ (সা.) মদ পান না করার আদেশ জারী করলেন। আদেশ পাওয়া মাত্র সাহাবীগণ নিজ নিজ ঘরে ব্যবহারের জন্যে রক্ষিত মদ ততক্ষণাৎ ফেলে দিলেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, যখন রাসলে-করীম (সা.)এর প্রেরিত এক ব্যক্তি মদীনার অলি-গলিতে প্রচার করতে লাগলেন যে, মদ্য পান হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তখন যার হাতে শরাবের যে পাত্র ছিল, তা তিনি সেখানেই ফেলে দিয়েছিলেন। যার কাছে মদের কলস বা মটকা ছিল, তা ঘর থেকে তৎক্ষণাৎ বের করে ভেঙ্গে ফেলেছেন। হযরত আনাস (রা.) তখন এক মজলিসে মদ্যপানে সাকীর কাজ স¤žাদন করছিলেন। আব তালহা, আব ওবায়দা ইবনুল জাররাহ, উবাই ইবনে কা’ব, সুহায়ল (রা.) প্রমুখ নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ সে মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। প্রচারকের ঘোষনা কানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন- এবার সম¯ শরাব ফেলে দাও। এর পেয়ালা, মটকা, হাঁড়ি ভেঙ্গে ফেল। অন্য বর্ণনায় আছে- হারাম ঘোষণার সময় যার হাতে শরাবের পেয়ালা ছিল এবং তা ঠোঁট ¯žর্শ করছিল, তাও তৎক্ষণাৎ সে অবস্থাতেই দুরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সেদিন মদীনায় এ পরিমাণ শরাব নিক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, বৃষ্টির পানির মত শরাব প্রবাহিত হয়ে যাŽিছল এবং দীর্ঘদিন পর্যš মদীনার অলি-গলির অবস্থা এমন ছিল যে, যখনই বৃষ্টি হতো তখন শরাবের গন্ধ ও রং মাটির উপর ফুটে উঠত।
যখন আদেশ হল, যার কাছে যে মদ আছে তা অমুক স্থানে একত্রিত কর, তখন সাহাবীগণ নির্ধারিত স্থানে সব মদ একত্রিত করলেন। হুযর (সা.) স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হয়ে স্বহ¯ে শরাবের অনেক পাত্র ভেঙ্গে ফেললেন এবং অবশিষ্টগুলো সাহাবীগণের দ্বারা ভাঙ্গিয়ে দিলেন। জনৈক সাহাবী মদের ব্যবসা করতেন এবং সিরিয়া থেকে মদ আমদানী করতেন। ঘটনাচক্রে তখন তিনি মদ আনার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গিয়েছিলেন। যখন তিনি ব্যবসায়ের এ পণ্য নিয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং মদীনায় প্রবেশ করার পর্বেই মদ হারাম হওয়ার সংবাদ তাঁর কানে পৌঁছল, তখন সে সাহাবীও তাঁর সমুদয় মাল, যা অনেক মুনাফার আশায় আনা হয়েছিল, এক পাহাড়ের পাদদেশে রেখে এসে হুযরে আকরাম (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে এসব স¤žদের ব্যাপারে কি করতে হবে তৎস¤žর্কে নির্দেশ প্রার্থনা করলেন। মহানবী (সা.) হুকুম করলেন- মটকাগুলো ভেঙ্গে সম¯ শরাব ভাসিয়ে দাও। অতঃপর বিনা আপত্তিতে তিনি তাঁর সম¯ পুঁজির বিনিময়ে সংগৃহীত এ পণ্য স্বহ¯ে মাটিতে ঢেলে দিলেন। এটাও ইসলামের মু’জিযা এবং সাহাবীগণের বিস্ময়কর আনুগত্যের নিদর্শন।
মানুষ কোন বিষয়ে অভ্য¯ হয়ে গেলে তা ত্যাগ করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। মদ্যপানে তখন সকলেই এমন অভ্য¯ ছিলেন যে, অল্পদিন তা থেকে বিরত থাকাও স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। কিন্তু নবী করীম (সা.)-এর একটিমাত্র নির্দেশই তাঁদের অভ্যাসে এমন অপর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করল যে, তারপর থেকে তাঁরা শরাবের প্রতি তেমনি ঘৃণা পোষণ করতে লাগলেন, যেমন পর্বে তাঁরা এর প্রতি আসক্ত ছিলেন [তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন]।
াআকাবার দ্বিতীয় শপথে রাসলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে মদীনাবাসী ৭৩ জন মুসলমান উপস্থিত। গভীর রাতে বৈঠক চলছে। মদীনাবাসীর দাবী তারা রাসলুল্লাহ (সা.) কে মদীনাতে যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান করবেন। বৈঠকে রাসলুল্লাহ (সা.) এর চাচা আব্বাসও উপস্থিত। তিনি তখনও মুসলমান হন নি। কিন্তু ভাতিজার কর্ম স্বচক্ষে দেখার এবং আনসারদের আšরিকতা ও আগ্রহের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার ইŽছায় তিনি বৈঠকে উপস্থিত হন। এতে তিনিই প্রথম বক্তব্য রাখেন। মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মুহাম্মদ (সা.) স¤žর্কে তারা যেরূপ অবগত আছেন যে, তিনি নিজ জন্মস্থানে সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করছেন এবং তাঁর গোত্র এখন পর্যš তাঁর সুরক্ষা করে আসছে। কিন্তু এখন যেহেতু তিনি মদীনাবাসীদের সাথে যেতে ইŽছুক সেহেতু তিনি (আব্বাস) বিষয়টি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করার জন্য তাদেরকে পরামর্শ দেন। তিনি তাদেরকে পুণরায় স্মরণ করিয়ে দেন, যদি তারা তাদের প্রতিজ্ঞা পালনে নিশ্চিত হন এবং রাসলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর শত্র€দের বির€দ্ধে সুরক্ষাদানে সক্ষম হন, তবে তার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু যদি তাঁরা মনে করেন যে, তিনি তাদের সাথে যোগদানের পর চাপের মুখে তাঁকে ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন কিংবা তাঁকে শত্র€দের নিকট সমর্পণ করবেন, তাহলে তিনি যে অবস্থায় আছেন তাঁকে সে অবস্থায় থাকতে দেওয়াই বাঞ্ছনীয় হবে।
তিনি তার বক্তব্য শেষ করার আগেই তদুত্তরে আনসারগণ বললেন, ‘আমরা আপনার বক্তব্য শুনেছি’। অতঃপর রাসলুল্লাহ (সা.)-কে উদ্দেশ্যে করে তারা বললেন, আপনি বলুন, হে আল্লাহর রাসল! আপনার এবং আপনার রবের স্বার্থে যা করণীয়, আপনি সে পদক্ষেপ গ্রহণ কর€ন’।
এর পর রাসলুল্লাহ (সা.) তাঁদের উদ্দেশ্যে এক অভিভাষণ দান করেন। তিনি কুরআন মাজীদ থেকে তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে আল্লাহর রা¯ায় আহ্বান জানান, ইসলামের প্রতিও শুভেŽছা জ্ঞাপনের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেন, ‘আমি আপনাদের নিকট থেকে এ মর্মে প্রতিশ্র€তি চাŽিছ যে, আপনারা আমাকে ঐরূপ প্রতিরক্ষা দান করবেন যেরূপ আপনারা আপনাদের ¯ীলোক ও সšান-সšতিদের দান করে থাকেন।’
এর প্রেক্ষিতে আল-বারা‘আ ইব্নে মা’রূর রাসলুল্লাহ (সা.)-এর হাত মুবারক আঁকড়ে ধরে বললেন, ‘নিশ্চয়, আমরা আপনাকে সত্য ধর্মসহ প্রেরণকারী মহান রবের শপথ করে বলছি, আমরা নিশ্চয় আপনাকে ঐরূপ সুরক্ষা দান করব যেরূপ আমরা আমাদের পরিবার-পরিজন ও সšান-সšতিদের দিয়ে থাকি। কারণ আমরা যোদ্ধার জাতি এবং বাপ-দাদাদের আমল হতে উত্তরাধিকারসত্রে সশ¯।’
এ পর্যায়ে আল-বারা‘আর কথার সাথে আবুল হায়ছাম ইবনুত তায়্যিহান রাসলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, ‘ইয়া রাসলুল্লাহ! আমাদের এবং লোকদের (অর্থাৎ ইয়াহদীদের) মধ্যে একটি চুক্তি আছে এবং আমরা তা থেকে সরে আসতেছি। কিন্তু যখন তা স¤žন্ন হবে এবং আল্লাহ তাআলা আপনাকে আপনার কর্মে জয়যুক্ত করবেন, তখন কি আপনি আমাদের ফেলে আপনার স¤ž্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করবেন?’
এতে রাসলুল্লাহ (সা.) স্মিতহাস্যে জবাব দিলেন ঃ ‘না, আমার রক্ত হŽেছ আপনাদের রক্ত এবং আমার জীবন হŽেছ আপনাদের জীবন। আমি আপনাদের লোক এবং আপনারা আমার লোক। আমি তাদের বির€দ্ধে যুদ্ধ করব, যাদের বির€দ্ধে আপনারা যুদ্ধ করেন এবং তাদের সাথে শাšি স্থাপন করব, যাদের সাথে আপনারা শাšি স্থাপন করেন’।
এর পর আবুল হায়ছাম তাঁর স¤ž্রদায়ের লোকদের দিকে ফিরে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, তাদের সাথে রাসলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে যাওয়ার অর্থ এই যে, আরবদেশের সকল লোক তাদের বিপক্ষ অবলম্বন করবে এবং তাদের কটাক্ষ জ্যা-মুক্ত তীরের ন্যায় তাদের বিদ্ধ করবে। সুতরাং যদি তাঁরা এরূপ নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারেন যে, সকল ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে হলেও কোন অবস্থাতেই তারা রাসলুল্লাহ (সা.)-কে পরিত্যাগ করবেন না, তবে তারা প্রতিশ্র€তি দিয়ে তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন। তখন তাদের সকলেই সমস্বরে বলে উঠেন যে, তারা তাদের প্রতিশ্র€তি রক্ষা করবেন এবং কোন অবস্থাতেই রাসলুল্লাহ (সা.)-কে পরিত্যাগ করবেন না।
অন্যরাও এই উপলক্ষে বক্তব্য রাখেন। এভাবে আস‘আদ ইব্নে যুরারা তাঁর স¤ž্রদায়ের লোকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি আবু হায়ছামের বক্তব্যের সমর্থনে তাদের মনে করিয়ে দেন যে, তারা এমন একটি গুর€ত্বপর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করতে যাŽেছন যার ফলে তারা আরবদের শত্র€তার নিশ্চিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবেন।
তদ্র€প আব্বাস ইব্নে ‘উবাদা ইব্নে নাদলা আল-আনসারী তাঁর স¤ž্রদায়ের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বক্তব্যে বলেন, ‘হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা! রাসলুল্লাহ (সা.)-কে প্রদত্ত প্রতিশ্র€তির বিষয়বস্তু আপনারা কি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন?’ তদুত্তরে তারা বললেন, ‘হা, পেরেছি’। আব্বাস ইব্নে উবাদা অতঃপর ব্যাখ্যা করে বলেন, আপনারা প্রয়োজনে রক্তক্ষয়ী লড়াই করবেন, প্রতিশ্র€তি দিলেন। সুতরাং যদি আপনারা মনে করেন, যখন বিপদ ঘনিয়ে আসবে, আপনাদের সহায়-স¤žদ ধ্বংস হবে এবং আপনাদের নেতৃবৃন্দ নিহত হতে থাকবেন, তখন আপনারা তাঁকে পরিত্যাগ করবেন, তবে এখনই তা কর€ন। কারণ ঐরূপ করাতে, আল্লাহর কসম! আপনারা ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্র¯ হবেন। কিন্তু যদি আপনারা এরূপ নিশ্চয়তা দিতে পারেন যে, আপনারা আপনাদের বাধ্যবাধকতা পরিপর্ণরূপে পালন করবেন, যদিও তাতে আপনাদের সহায়-স¤žদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ও আপনাদের নেতৃবৃন্দ শহীদ হন, তবে এ গুর€দায়িত্ব গ্রহণ কর€ন। কারণ আল্লাহ তাআলার কসম! এটি আপনাদের ইহকাল ও পরকালের জন্য সর্বোত্তম পাথেয় হবে’।
তদুত্তরে তারা সকলেই বললেন, ‘নিশ্চয় আমরা আমাদের প্রতিশ্র€তি পালন করব, যদিও এর মল্য হিসেবে আমাদের সহায়-স¤žদ ও নেতৃবৃন্দকে বিসর্জন দিতে হয়’। এর পর আল-আব্বাস ইব্নে ‘উবাদা রাসলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসলাল্লাহ! যদি আমরা আমাদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে পারি তবে আমাদের পুরস্কার কি হবে?’ রাসলুল্লাহ (সা,) বললেন, ‘জান্নাত’। তারা বললেন ‘তা হলে আপনার হ¯দ্বয় প্রসারিত কর€ন’। রাসলুল্লাহ (সা.) তা-ই করলেন এবং তাঁরা শপথ গ্রহণ করলেন।
আকাবাতে সে স্মরণীয় রাতের কার্যবিবরণীর এ সকল সার-সংক্ষেপ হতে এটা ¯žষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আব্বাস ইব্নে আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক আনসারদের নিকট থেকে নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্র€তি গ্রহণ ছাড়াও ঐ সময় আনসারগণ নিজেরা অত্যš সতর্কতার সাথে তাঁদের কার্যক্রমের পুণর্মল্যায়ন করে এর পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন ফলাফল বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভ করেন। তাঁরা পরিপর্ণরূপে বুঝতে পারেন যে, প্রয়োজন হলে এবং রাসলুল্লাহ (সা.) চাইলে রাসলুল্লাহ (সা.) এবং ইসলামের স্বার্থে তাঁরা যুদ্ধে শহীদ হবেন এবং তাঁদের সহায়-স¤žদ ও ধন-জন কুরবানী দিবেন [সীরাত বিশ্বকোষ]।
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আকাবার দ্বিতীয় শপথে যে ৭৩ জন মদীনাবাসী রাসলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসেছিলেন তারা প্রায় সকলেই ছিলেন নও মুসলিম। কিন্তু ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাদের বিশ্বাস, আšরিকতা ও আনুগত্য অল্প সময়ে এত অধিক হয়েছিল যে, তারা রাসলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য নিজেদের জান-মাল কুররানের প্রতিশ্র€তি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। মদীনাবাসীগণ আকাবার এ শপথে যে প্রতিশ্র€তি দিয়েছিলেন বা¯ব জীবনে তাঁরা এর প্রমাণও দিয়েছেন।